মশা এরোসোলকে থোড়াই কেয়ার করে। এ ছিটিয়ে কোনো ফায়দা হয়না। কিছু মশা অবশ্য ডিগবাজি খেয়ে এরোসোলের উপকারীতা জাহির করার চেষ্টা করে, কিন্তু ঐ পর্যন্তই। ডিগবাজি খাওয়া মশারা এমনিই মরে, এরোসোল ছিটালেই কি, না ছিটালে কি। আমার সাথে কমজোরী মশাদের কিছুটা মিল আছে। আমার উথান কি, আবার পতনই বা কি? আমিতো পতিত হয়েই আছি। পাহাড়াদারদের হুইশেল শুনতে পাচ্ছি। মৃত রাত। শরীরের সব স্নায়ু আরাম চাচ্ছে, মাথার প্রতিটি অনু-পরমানু ঘুম চাচ্ছে, কিন্তু ঘুম আসছে না। এ আমার দোষ না। এ এক ব্যামো। এ ব্যামোর কোনো চিকিৎসা নেই।
নিরাময়হীন ব্যামো নিয়ে সুখে আছি। সারাদিন কেটেছে ব্যস্ততায়। সকালেতো ঘুম থেকে উঠতে পারিনা। একজন ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলো। সাথে অবশ্য ফ্রি কিছু টিপস। ও আমার দ্বারা হবেনা। সাউন্ড হেলথ এবং মাইন্ড নিয়ে দিব্বি সুস্থ্য সবল একজন মানুষ আমি। আমার আবার বাড়তি কিছু করার প্রয়োজন কি? উঠেই পিসিটা অন করলাম। গান বাজছে- 'এই নীল মনিহার'। ভালো একটা গান। ঠিক নয়টায় আমরা পল্লবী বাসষ্ট্যান্ডে মিলিত হলাম। আজকে আমার সহকারী বাংলা কলেজের এক ছোট ভাই। ছেলেটা দারুন। কথা বলে টনটন এবং অবশ্য খুব সুন্দর সৎ ছেলে। আই লাইক হীম। ঘটনার মতো ঘটনা ঘটেছে অনেক। ওসব বলতে ইচ্ছে করছে না। নিজের কথা বলি। হরিবল। সবইতো নিজের কথা! শুরু করি তবে পরের কথা। বড় চাচা ইন্তেকাল ফরমাইবেন শিঘ্রির। ডাক্তাররা আশা ছেড়ে দিয়েছেন। আমায় বারবার ফোন করা হচ্ছে। বারবার বলেছি- আসছি। যাওয়া হচ্ছেনা। বুঝতে পারছিনা যাবো কি যাবো না। বউ থাকলে ভালো হতো। জোর করে অলস এই আমাকে ঐ বাড়িতে পাঠাতো। কাছেইতো। গাজীপুর অতো দূর না। কিন্তু আমি ঐ ব্যাটাকে প্রচুর ঘৃনা করি। প্রচুর। মরুক। উহু এখন অনুভূতিটা অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। আর যাইহোক, জ্ঞাতী গুষ্ঠিতো। রক্তের টান এই তবে! বুকটা একটু কাঁপলো কি? ধুররররর ওসবে আমি বিশ্বাস করিনা।
আম্মা ভালো নেই। সে আমি ভালো বুঝি। অপারেশন কবে করাবো? জবাব জানা নাই। সবাই নিশ্চুপ। কিন্তু আম্মা যেটা ভাবছে সেটা কখনোই হবেনা। সে আমি জানি। আমি আমার নিয়তি পরির্বতন করতে পারি। এসব ভাবতে গেলে সব জট পাকিয়ে যায়। ইসসস বউ থাকলে ভালো হতো। বউ আমাকে পিটুনি দিয়ে ঠিক করে দিতো। আম্মার ছেলে বানিয়ে ছাড়তোই ছাড়তো। কিইবা আর করার। বউ নেই। তাই সংসার দরদী হতে পারছিনে।
সে-যাইহোক, বেশি ভাবের কথা বলা শুরু হয়ে গেছে। ওসব বাদ। নতুন কিছু চিন্তা করা যাক। ভাবনারা অমনই, তুমি ওকে পাশে বসিয়ে আদর করবে, সে উঠবে তোমার কোলে। কোলে উঠিয়ে আদর করবে, ও উঠে যাবে তোমার ঘাড়ে, তারপর তোমার মাথায় উঠে হিসু করে দিবে। ভাবনারা অমনই। ভাবতে আমার ঘৃনা লাগেনা। আমি ভাবতে থাকি। কতো কিছু। এইযে ঘুম আসছেনা কেন সেটা নিয়েও ভাবছি। এতো শক্ত হৃদয় নিয়ে কিকরে বেঁচে আছি সেটা নিয়েও ভাবছি। সমানে ভাবছি ফালতু কিছু মানুষ নিয়ে মাঝে মাঝে কেনো ভাবি, সেটা নিয়েও। হুররর আমি কি ভাবের কারখানা নাকি? অতো ভাবনা ভেবে আমারই বা কি লাভ! উহু ভুল বললাম। লাভ আছে বৈকি এবং আমার সাথে যে পাড়ার নুনু পাগলার দারুন মিল সে খবরও আমি রাখি। হা হা হা হা হা হা।
ও-য়েল। বেশি আনন্দ করা ভালো না। বেশি চিনি দিয়ে চা বানালে সেটা ভালো লাগেনা। চায়ের সাথে থাকবে, পরিমান মতো চিনি, দুধ আর লিকার। যেকোন একটার উপস্থিতি বেড়ে গেলেই বাঁধবে বিপত্তি। আমার লাইফে অবশ্য বিপত্তিটাই বেশি। কখনো ভালোবাসা উথলে যায়, কখনো ঘৃনা। কখনো প্রাপ্তি সীমাহীন, কখনো অপ্রাপ্তি। কখনো বসন্ত, কখনো ধু ধু শূণ্যতা। ধুররর শালা মর তুই কলাগাছে ফাঁস দিয়ে। সবচেয়ে সিক্রেট একটা কথা বলি তোকে- আমি মানুষটা অবশ্যই খারাপ না। কিন্তু আবার ভালোও নই। আছেনা কিছু অসুস্থ্য মানুষ, পৃথিবীতে, যারা যতোসব অসুস্থ্য কথা ভাবে- আমি ঠিক তেমন একজন মানুষ। হুমমমম আমি অসুস্থ্য একজন মানুষ। আমার মতো মানুষের পৃথিবীতে না থাকাই বেটার। প্রশ্ন করিস না অসুস্থ্যটা আবার কেমনতর অসুস্থ্যতা। করে ফেলেছিস?! ঠি...ক আছে, তোকে বলতে পারি, কারণ তোকে আমি ভালো পাই। অসুস্থ্যতা বুঝতে হলে- আমার সামনে তোকে বসতে হবে। মুখোমুখি। আমার হাত ধরতে হবে। উহু এ হাতের পর নিরাপত্তা খুঁজিস না। ঐ জিনিসটা হৃদযন্ত্রের কাছাকাছি কোথাও তুলে রাখা আছে। এবার আমার চোখে তাকিয়ে তোকে বিশ্ব দেখতে হবে। আ-মা-র বিশ্ব। তোর মতো করে। আমার শ্বাস তোকে উপলব্ধি করতে হবে। আমার সবুজ তোকে অনুভব করতে হবে। আমার ভালো লাগা, তোর আঁচলে বাঁধতে হবে। তোর চোখের ঘন মায়ায় আলো রেখে আমায় ভালোবাসতে হবে... গভির ভাবে... কিছুটা আমার মতো করে... কিছুটা তোর মতো করে...।
চিৎকার-১ : 'তুই' শব্দের সাথে কোন জীবিত মানুষের সম্পর্ক নেই।
চিৎকার-২ : যন্ত্রণাটা লেখা হয়েছে ২৯ নভেম্বরের মৃত রাতে।
Friday, November 30, 2007
Wednesday, November 28, 2007
হৃদয়হীন সিডর এবং মানুষের ভালোবাসা
আমি যেমন ভালো বন্ধু সার্কেল পেয়ে দারুন তৃপ্তির ঢেকুর তুলি, তেমনি ওদের নিয়ে আমার একটা লুকনো কষ্টও আছে। ওরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। জন্ম থেকেই। তাই ওরা ওদের চারপাশে যা দেখে তা সবই সৌন্দর্য্য নির্ভর। ওদের সমস্ত চিন্তা-ভাবনা ওদের কেরিয়ার আর ভালোবাসা ভালোবাসা খেলা-খেলি নিয়ে। মাঝে মাঝে যে ওরা অনাহারী মানুষ নিয়ে ভাবনা চিন্তা করেনা সেটাও ঠিক না। ওরাও অনাহারী, বিপদগামী মানুষ নিয়ে কথা বলে, ওরাও দূর্যোগ নিয়ে ভাবে এবং ওরাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় কিন্তু নিজেরা কখনোই সক্রীয় ভূমিকা পালনে অগ্রগামী হয়না। ওরা আর্থিকভাবে সাহায্য করতে প্রস্তুত কিন্তু মাঠে নেমে একটা জোয়ার তুলে, মানুষের ভেতর মমতার এক জাগরণ সৃষ্টি করতে ওদের কোনো ইচ্ছা নেই।
এটাই স্বাভাবিক। দেশের উচ্চবিত্ত মানুষের দায় পড়েনি অনাহারী মানুষ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার। যারা ভালো অবস্থানে আছে তারা কখনোই চায়না শুধু শুধু কষ্টকে ডাক দিয়ে ঘরে আশ্রয় দেয়া। কিছু কিছু মানুষ আছে যারা জন্ম থেকেই একটু অন্যরকম। ওদের নিয়ে লেখার সামর্থ্য আমার নাই। ওরা ওদেরই মতো। ওদেরকে শব্দের খাঁচায় আটকানো সহজ নয়।
ইতিমধ্যে মিরপুরবাসী একটা ঘটনা প্রতিদিন দেখছে। দুর্গত মানুষের দুর্দশার কথা ভরা প্লে-কার্ড গলায় ঝুলিয়ে কিছু উচ্ছ্বল তরুন একটা হলুদ বাক্স নিয়ে সাহায্যের আহবানে যাচ্ছে মানুষের বিবেকের দ্বারে দ্বারে। হাঁ বলছিলাম, বির্বতন বাংলাদেশ এর কথা। আমাদের সংগঠন এর কথা। কিছু সম-চিন্তাশীল কিশোর এই সংগঠনের সদস্য। ওরা সবাই বন্ধু নয়, একই পাড়ায়ও থাকেনা, একই কলেজেও পড়েনা। তবু ওরা আত্মীয়। আত্মার আত্মীয়।
প্রথম দিন শুধুমাত্র রেলী দিয়ে শুরু, মাইকিং করে এবং ব্যানার লাগিয়ে আমরা মার্চ করেছি প্রধান সড়কগুলোয়। ঐদিন অর্ধবেলা পর্যন্ত উঠেছে- ৪৬৭৩ টাকা। তারপরের দিন কৌশল বদলানো হলো। মিরপুর কাজী পাড়া থেকে সর্বোচ্চ বিজয় স্মরনী পর্যন্ত আমরা সিটিং গেটলক গাড়িগুলোতে (বিকল্প-১৭, ঢাকেশ্বরী-৩৬, ভলভো, ডিসকভারী, একুশে ইত্যাদি) ৭টা টীম করে ভীক্ষা (কারণ অনেক ভদ্র মানুষ 'মাপ' করতে বলেছেন!) করার জন্য সকাল থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করেছি। প্রতিটি বাসে ২জন করে। একজন পুরনো মেম্বার, একজন নতুন মেম্বার। পুরনো মেম্বার ব্রীফ দিবে, নতুন মেম্বার হলুদ বাক্সটা নিয়ে প্রতিটি যাত্রীর কাছে যাবে। ব্যাপারটা খুবই মজার। এসব বাসে আগে উঠতো নেশাখোড়রা, এখন উঠছি আমরা! ব্রিফিংয়ে কোনো মুখস্ত বিদ্যা ঝাড়তে হয়না আমাদের। বাস্তবে দেশের যা অবস্থা তাই বলেছি আমরা। সে যাইহোক, প্রথম দিন আমরা তুলেছি ২১ হাজারের মতো। দ্বিতীয় দিন উঠেছে ২৩ হাজার টাকা। তৃতীয় দিন উঠেছে ২১ হাজার ৯২টাকা। আমরা ডিসেম্বর ১০ তারিখ পর্যন্ত এই ত্রাণ সংগ্রহ করে যাবো। ইতিমধ্যে শীতবস্ত্র এবং আনুসাঙ্গিক পোষাক সংগ্রহ শেষ হয়েছে। আমাদের টার্গেট ২ হাজার ৫শ কেজি চাল বিতরণ করা, পাশাপাশি অন্যান্য ত্রাণ সামগ্রী। আশা করা যাচ্ছে আগামী দশ তারিখের আগে এই টার্গেট শেষ করা যাবে।
এই কাজ করতে করতে যা অভিজ্ঞতা হচ্ছে তা সবই পুরনো। কিছু তৈলাক্ত চেহারার মানুষ প্রায় প্রতিটি বাসে আমাদেরকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছে। কেউ বলেছে তোমরা যে কলেজ/ভার্সিটির ছাত্র সেটার ডকুমেন্ট কি? তোমাদের আইডি দেখাও, কার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এসব উঠাচ্ছো? ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা সবই ওভারকাম করেছি। কমিশনারের অনুমতি, পুলিশ প্রশাসনের অনুমতি, প্রতিটি সিটিং গেটলক বাসগুলোর হেড অফিসেই আগে থেকেই জানানো হয়েছে, আর আছে আমাদের পরিচয় পত্র। আবার এমনো হয়েছে, যাত্রীরা নিজেদের মধ্যে শুরু করে দিয়েছে ঝগড়া-ঝাটি। তবে সব ছাড়িয়ে মানুষের ভালোবাসাটা সবসময় জয়ী হয়েছে। তৈলাক্ত চেহারার মানুষগুলো কখনোই সঙ্গী পায়নি। যাত্রীরাই কেউ কেউ তাকে বলছে- মিষ্টার ওরাতো বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য পথে নেমেছে আপনি কি করেছেন? আপনি উল্টো তাদেরকে থামিয়ে দেবার চেষ্টা করছেন! কেউ বলছে- অশিক্ষিত বুঝেও না কারা ছাত্র, কারা নেশাখোড়!
আজ আমার ছুটির দিন। আসলে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভ্রমন করা তারপর ব্রিফ দেয়া কম কষ্টসাধ্য নয়। দুপুরে লান্স করতে হয়েছে হোটেলগুলোতেই। ২টা করে নাল-রুটি আর সবজি ভাজি। দুইদিনেই সবাই মোটামুটি অর্ধেক। নতুন কিছু মেম্বার যুক্ত হয়েছে তারাই আজ কাজ করছে, আছে কিছু পুরনে মেম্বার।
সবশেষে বলতে পারি, বাংলাদেশের মানুষের মতো মমতা অন্য কোথাও নেই। যদিও আমি বাংলাদেশের সীমানা আজ পর্যন্ত ক্রশ করতে পারি নাই তবু বলছি কিছু ঘটনার মুখোমুখি হয়েই।
ঘটনা-১ :
আমি এবং আমার সহকারী বিজয় স্মরণীতে নেমে ফিরতি বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছি। সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে (যেহেতু আমাদের বুকে বড় সাইজের প্লে-কার্ড ঝুলানো এবং বুকের বাম পাশে পরিচয়পত্র, এবং হলুদ বাক্স অবশ্যই একটা কারণ)। এমন সময় একটা হ্যাংলা লোক এসে বললো- ভাই আমার কাছে ১ টাকা আছে, আর কোনো টাকা পয়সা নাই। আমি কি আপনাদের এই এক টাকা দিতে পারি? তার কথা শুনে আমার এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো, তাকে খুব খুব আপন মনে হলো, এবং অবশ্যই তার কাছ থেকে ১ টাকা পরম মমতায় নেয়া হলো। লোকটা চলে গেলো।
ঘটনা-২ :
আমরা প্রতিটি বাসে যা উঠেছে তা বাস থেকে নেমে যাবার পর টোটাল অংকটা বলে যাই। ঠিক এভাবে- ধন্যবাদ যাত্রীমহোদয়গণ, বিপদগামী মানুষগুলো পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য। আমরা এই বাসে আপনাদের কাছ থেকে এ পর্যন্ত সাহায্য পেয়েছি মোট- এতো টাকা। অনেক ধন্যবাদ আপনাদের। তো সেদিন আমি নিয়ম মাফিক এটা বলে ঘুরছি বাস থেকে নেমে যাবার জন্য, তখনি এক বৃদ্ধা পাশ থেকে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলছে- বাবা, আল্লায় তোদের অনেক ভালো করবেন। তার চোখ অশ্রুসিক্ত। আমরা নেমে গেলাম।
ঘটনা-৩ :
শেওড়া পাড়ায় আমরা মিলিত হলাম, সব টীম। সব বাক্স ব্রীজের নিচের পিলারের পাশে একের পর এক সাজিয়ে রাখা হলো। সবগুলোই ভারী হয়ে গেছে। আমরা অপেক্ষা করছি অবশিষ্ট মেম্বারদের জন্য। টুকটাক কথা বলছি, এমন সময় এক বৃদ্ধা ভিক্ষুক এসে বললো- বাবা আমি টাকা দেবো, কার কাছে দেবো? আমরাতো সবাই রীতিমতো অবাক! আমাদের এক সহকর্মী হুড়োহুড়ি করে তার বাক্সটা বের করে বললো- আন্টি আমারটায় দেন, আমারটায় দেন, আমার বাক্সে আজ টাকা কম উঠেছে। বৃদ্ধার চোখে সেই কি মমতা, মুখে চির সুবজ হাসি। প্রাণ খোলা হাসি। বৃদ্ধা মাথা নাড়তে নাড়তে চলে গেলেন।
আসলে আমরা কাজ করার শক্তি পাচ্ছি এনাদের ভালোবাসা পেয়েই। তাঁদের ভালোবাসাই আমাদের কাজ করার অনুপ্রেরণা। তারা আজীবন ভালো থাকুন, সুস্থ্য থাকুন, সে কামনা করি।
এটাই স্বাভাবিক। দেশের উচ্চবিত্ত মানুষের দায় পড়েনি অনাহারী মানুষ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার। যারা ভালো অবস্থানে আছে তারা কখনোই চায়না শুধু শুধু কষ্টকে ডাক দিয়ে ঘরে আশ্রয় দেয়া। কিছু কিছু মানুষ আছে যারা জন্ম থেকেই একটু অন্যরকম। ওদের নিয়ে লেখার সামর্থ্য আমার নাই। ওরা ওদেরই মতো। ওদেরকে শব্দের খাঁচায় আটকানো সহজ নয়।
ইতিমধ্যে মিরপুরবাসী একটা ঘটনা প্রতিদিন দেখছে। দুর্গত মানুষের দুর্দশার কথা ভরা প্লে-কার্ড গলায় ঝুলিয়ে কিছু উচ্ছ্বল তরুন একটা হলুদ বাক্স নিয়ে সাহায্যের আহবানে যাচ্ছে মানুষের বিবেকের দ্বারে দ্বারে। হাঁ বলছিলাম, বির্বতন বাংলাদেশ এর কথা। আমাদের সংগঠন এর কথা। কিছু সম-চিন্তাশীল কিশোর এই সংগঠনের সদস্য। ওরা সবাই বন্ধু নয়, একই পাড়ায়ও থাকেনা, একই কলেজেও পড়েনা। তবু ওরা আত্মীয়। আত্মার আত্মীয়।
প্রথম দিন শুধুমাত্র রেলী দিয়ে শুরু, মাইকিং করে এবং ব্যানার লাগিয়ে আমরা মার্চ করেছি প্রধান সড়কগুলোয়। ঐদিন অর্ধবেলা পর্যন্ত উঠেছে- ৪৬৭৩ টাকা। তারপরের দিন কৌশল বদলানো হলো। মিরপুর কাজী পাড়া থেকে সর্বোচ্চ বিজয় স্মরনী পর্যন্ত আমরা সিটিং গেটলক গাড়িগুলোতে (বিকল্প-১৭, ঢাকেশ্বরী-৩৬, ভলভো, ডিসকভারী, একুশে ইত্যাদি) ৭টা টীম করে ভীক্ষা (কারণ অনেক ভদ্র মানুষ 'মাপ' করতে বলেছেন!) করার জন্য সকাল থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করেছি। প্রতিটি বাসে ২জন করে। একজন পুরনো মেম্বার, একজন নতুন মেম্বার। পুরনো মেম্বার ব্রীফ দিবে, নতুন মেম্বার হলুদ বাক্সটা নিয়ে প্রতিটি যাত্রীর কাছে যাবে। ব্যাপারটা খুবই মজার। এসব বাসে আগে উঠতো নেশাখোড়রা, এখন উঠছি আমরা! ব্রিফিংয়ে কোনো মুখস্ত বিদ্যা ঝাড়তে হয়না আমাদের। বাস্তবে দেশের যা অবস্থা তাই বলেছি আমরা। সে যাইহোক, প্রথম দিন আমরা তুলেছি ২১ হাজারের মতো। দ্বিতীয় দিন উঠেছে ২৩ হাজার টাকা। তৃতীয় দিন উঠেছে ২১ হাজার ৯২টাকা। আমরা ডিসেম্বর ১০ তারিখ পর্যন্ত এই ত্রাণ সংগ্রহ করে যাবো। ইতিমধ্যে শীতবস্ত্র এবং আনুসাঙ্গিক পোষাক সংগ্রহ শেষ হয়েছে। আমাদের টার্গেট ২ হাজার ৫শ কেজি চাল বিতরণ করা, পাশাপাশি অন্যান্য ত্রাণ সামগ্রী। আশা করা যাচ্ছে আগামী দশ তারিখের আগে এই টার্গেট শেষ করা যাবে।
এই কাজ করতে করতে যা অভিজ্ঞতা হচ্ছে তা সবই পুরনো। কিছু তৈলাক্ত চেহারার মানুষ প্রায় প্রতিটি বাসে আমাদেরকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছে। কেউ বলেছে তোমরা যে কলেজ/ভার্সিটির ছাত্র সেটার ডকুমেন্ট কি? তোমাদের আইডি দেখাও, কার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এসব উঠাচ্ছো? ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা সবই ওভারকাম করেছি। কমিশনারের অনুমতি, পুলিশ প্রশাসনের অনুমতি, প্রতিটি সিটিং গেটলক বাসগুলোর হেড অফিসেই আগে থেকেই জানানো হয়েছে, আর আছে আমাদের পরিচয় পত্র। আবার এমনো হয়েছে, যাত্রীরা নিজেদের মধ্যে শুরু করে দিয়েছে ঝগড়া-ঝাটি। তবে সব ছাড়িয়ে মানুষের ভালোবাসাটা সবসময় জয়ী হয়েছে। তৈলাক্ত চেহারার মানুষগুলো কখনোই সঙ্গী পায়নি। যাত্রীরাই কেউ কেউ তাকে বলছে- মিষ্টার ওরাতো বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য পথে নেমেছে আপনি কি করেছেন? আপনি উল্টো তাদেরকে থামিয়ে দেবার চেষ্টা করছেন! কেউ বলছে- অশিক্ষিত বুঝেও না কারা ছাত্র, কারা নেশাখোড়!
আজ আমার ছুটির দিন। আসলে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভ্রমন করা তারপর ব্রিফ দেয়া কম কষ্টসাধ্য নয়। দুপুরে লান্স করতে হয়েছে হোটেলগুলোতেই। ২টা করে নাল-রুটি আর সবজি ভাজি। দুইদিনেই সবাই মোটামুটি অর্ধেক। নতুন কিছু মেম্বার যুক্ত হয়েছে তারাই আজ কাজ করছে, আছে কিছু পুরনে মেম্বার।
সবশেষে বলতে পারি, বাংলাদেশের মানুষের মতো মমতা অন্য কোথাও নেই। যদিও আমি বাংলাদেশের সীমানা আজ পর্যন্ত ক্রশ করতে পারি নাই তবু বলছি কিছু ঘটনার মুখোমুখি হয়েই।
ঘটনা-১ :
আমি এবং আমার সহকারী বিজয় স্মরণীতে নেমে ফিরতি বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছি। সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে (যেহেতু আমাদের বুকে বড় সাইজের প্লে-কার্ড ঝুলানো এবং বুকের বাম পাশে পরিচয়পত্র, এবং হলুদ বাক্স অবশ্যই একটা কারণ)। এমন সময় একটা হ্যাংলা লোক এসে বললো- ভাই আমার কাছে ১ টাকা আছে, আর কোনো টাকা পয়সা নাই। আমি কি আপনাদের এই এক টাকা দিতে পারি? তার কথা শুনে আমার এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো, তাকে খুব খুব আপন মনে হলো, এবং অবশ্যই তার কাছ থেকে ১ টাকা পরম মমতায় নেয়া হলো। লোকটা চলে গেলো।
ঘটনা-২ :
আমরা প্রতিটি বাসে যা উঠেছে তা বাস থেকে নেমে যাবার পর টোটাল অংকটা বলে যাই। ঠিক এভাবে- ধন্যবাদ যাত্রীমহোদয়গণ, বিপদগামী মানুষগুলো পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য। আমরা এই বাসে আপনাদের কাছ থেকে এ পর্যন্ত সাহায্য পেয়েছি মোট- এতো টাকা। অনেক ধন্যবাদ আপনাদের। তো সেদিন আমি নিয়ম মাফিক এটা বলে ঘুরছি বাস থেকে নেমে যাবার জন্য, তখনি এক বৃদ্ধা পাশ থেকে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলছে- বাবা, আল্লায় তোদের অনেক ভালো করবেন। তার চোখ অশ্রুসিক্ত। আমরা নেমে গেলাম।
ঘটনা-৩ :
শেওড়া পাড়ায় আমরা মিলিত হলাম, সব টীম। সব বাক্স ব্রীজের নিচের পিলারের পাশে একের পর এক সাজিয়ে রাখা হলো। সবগুলোই ভারী হয়ে গেছে। আমরা অপেক্ষা করছি অবশিষ্ট মেম্বারদের জন্য। টুকটাক কথা বলছি, এমন সময় এক বৃদ্ধা ভিক্ষুক এসে বললো- বাবা আমি টাকা দেবো, কার কাছে দেবো? আমরাতো সবাই রীতিমতো অবাক! আমাদের এক সহকর্মী হুড়োহুড়ি করে তার বাক্সটা বের করে বললো- আন্টি আমারটায় দেন, আমারটায় দেন, আমার বাক্সে আজ টাকা কম উঠেছে। বৃদ্ধার চোখে সেই কি মমতা, মুখে চির সুবজ হাসি। প্রাণ খোলা হাসি। বৃদ্ধা মাথা নাড়তে নাড়তে চলে গেলেন।
আসলে আমরা কাজ করার শক্তি পাচ্ছি এনাদের ভালোবাসা পেয়েই। তাঁদের ভালোবাসাই আমাদের কাজ করার অনুপ্রেরণা। তারা আজীবন ভালো থাকুন, সুস্থ্য থাকুন, সে কামনা করি।
Labels:
আশা-নিরাশা,
ছেঁড়া মানুষের গল্প,
ভাঙ্গা-গড়া,
স্বপ্ন সবুজ
Monday, November 26, 2007
ভেবোনা মিছে কবি
আমি এখন ঘুমোতে পারিনা। রাতে ঘুম হয়না। কেন হয়না সেটা আমি নিজেও জানিনা। কিংবা হয়তো জানি। এ আমি বলতে পারবো না। বুঝাতে পারবোনা। কতো হাবিজাবি চিন্তা-ভাবনা... সব বিছানায় গেলে জেগে ওঠে। একটানা। আঠালো। বাংলা সিনেমার মতো দীর্ঘ। রাতের বেশির ভাগ সময় কাটে তাই ছাদে শুয়ে বসে। ইদানিং তাও হচ্ছে না। মশার ভৌ শব্দ আমার জঘন্য লাগে। তদোপরী শীত নেমে গেছে। আজ অবশ্য আকাশে পূর্ণিমা চাঁদ। চারদিক ঝলমল করছে। রুপোর মতো। বাড়ির সামনে বিরাট হাসনা-হেনাটা পৃথিবীকে সুরভিত করছে হালকাচালে। কোথাও কেউ নেই। নিরব। কাছে কোথাও আত্মনার্ধ করে কেঁদে ওঠে কোনো পথ কুকুর। তারপর আবার সেই ঘোর নিস্তব্ধতা। পূর্ণিমা নিয়ে আমি ক্লাশ নাইন/টেনে কয়েকটা কবিতা লিখেছি। ওসব হারিয়ে টারিয়ে গেছে। খুব অগোছানো মানুষ আমি। কোথাও গোছগাছ নেই আমার। না ভেতরে, না বাইরে। এখন কবিতা লিখতে ইচ্ছে করেনা, কিংবা এ নিয়ে দুয়েক লাইন ডায়রীর পাতা জুড়ে- লিখতে ইচ্ছে করেনা। বড় অলস আমি। এই আলসে মাখা মনে হঠাৎ হঠাৎ হা হা করে ওঠে, এখন। কেনো ওঠে জানিনা।
তুই কখনো কোনো মানুষকে মরতে দেখেছিস? আমি দেখেছি। কেমন অসহায় থাকে তখন সে। কেমন ঘোরতর এক শূণ্যতা থাকে তার সবকিছু জুড়ে। থাকে তার চারপাশে অদ্ভুত, অচেনা-অজানা এক ধোঁয়াটে গন্ধ। এসব যদিওবা সহ্য করা যায় কিন্তু মৃত মানুষের চেহারা আমি সহ্য করতে পারিনা, একদম। ওতে আমি আলো দেখিনা, হাসি দেখিনা, চোখের মায়াময় দৃষ্টি দেখিনা। প্রথম যাকে মরতে দেখেছিলাম তখন সেটা উপলব্ধি করার মতো বয়স ছিলোনা। দ্বিতীয়বার যাকে মরতে দেখলাম এবং যে আমার হাতের উপরই মারা গেলো তার ঘন্টা কয়েক আগ পর্যন্ত আমি তার ১শ মাইলের ভেতরো ছিলাম না। মাস দুই পর আমি যখন তার নিকট পৌঁছলাম তখন আমার বয়স যথেষ্ঠ বুদ্ধিমান ছিলো এটা বুঝতে যে পুরুষ মানুষও কখনো সখনো কান্না-কাটি করে। আমি বুঝতে পারছিলাম না ঠিক আমি কি হারাচ্ছি। আমার দুচোখ ছুঁয়ে যে জল গড়িয়ে যাচ্ছিলো সেটা কতোটা বছর পর গড়াচ্ছে তার সঠিক ক্যালকুলেশন এতোটা বছর পর এতোটা তীহ্ম আর কৌশলী ব্রেন নিয়েও আমি সমাধা করতে ব্যর্থ।
আজ পূর্ণিমা। তাই মশার ভৌ শব্দের জ্বালাতন উপেক্ষা করে কিছু লিখতে বসা আমার। রুপোলী আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে আমার ঘরের চারপাশ এবং আমি। কোন ছাগল পূর্ণিমাকে ঝলসানো রুটি বলেছে সেটা মনে করতে পারছি না। এতো সুন্দর একটা মুখকে কেউ ঝলসানো রুটি বলতে পারে? কবিরা এমনিতেই মিথ্যুক হয়। মিথ্যে আর কল্পনা ছাড়া কবিতা লেখা সম্ভব না। আমি সাহিত্যিক না। কবি না। কিন্তু মাঝে মাঝে আমার খুব লিখতে ইচ্ছে করে। নিলর্জ্বের মতো। লিখি না আমি। লিখতে ভাল্লাগে না।
যখন ডায়রী লিখতাম তখন অদ্ভুত সব বিষয় নিয়ে লিখতাম। কাকের ঠ্যাং, বকের ঠ্যাং নিয়ে আমার সুদূর প্রসারী গভেষনা থেকে শুরু করে স্বপ্নাকে লেখা কতোশতো কবিতা, প্রেমপত্র, প্রেম নিয়ে আবেগ টসটস কতোশত কথা... ভালোলাগা ছিলো ওতে। প্রথম ডাইরীটা আমি কয়েকটা চিঠির সাথে পুড়িয়ে ফেলেছি। ২য় ডায়রীটা পড়িনা। তার অক্ষত থাকাটা একটা বিস্ময়। তৃতীয় ডায়রীটা আমার পাগলাটে, অসমাপ্ত। ছেঁড়া ছেঁড়া, ভাসা ভাসা কতো কি ওতে ভরা। শার্ট, প্যান্ট, শর্ট, গ্যাঞ্জি, স্যান্ডেলের তালিকা থেকে ওতে প্রেমপত্র পর্যন্ত লেখা। আছে গিটারের কিছু কর্ড। কিছু নিজের লেখা গান। কিছু প্রিয় মানুষ নিয়ে মূল্যায়ন। আছে কিছু প্রিয় চেহারা আঁকার কতোশতো বাহারী প্রচেষ্টা। রাস্তায় কোনো ফকিরকে ভালো লেগেছে সে অনুভূতি নিয়েও কয়েক লাইন... এসব...।
এখন ডায়রী টাইরী লেখা হয়না। প্রযুক্তি মানুষকে খুব বদলে দিচ্ছে। অনলাইনেই এখন ভাব বিনিময় করা যায় হারহামেশা। জীবন কতো সহজ এখানে। বৃষ্টি বাদলের মতো কতো ঝরঝরে আবেগ এখানে, ঘুরোঘুরি করে। মানুষ কতো সহজে নিজেকে এখানে গোছগাছ করতে পারে...। আমি এখনো প্রযুক্তির সাথে নিজেকে মানিয়ে পারিনি অতো। খুব অগোছালো, আর খুব ঘাড় ট্যারারা হয়তো এসবে মানিয়ে নিতে পারেনা। আমার ওতে কোনো দাবী নেই। নিজের প্রতি স্লেশ কিংবা তিক্ততাও নেই। আমি যা দাবি করি, যা ভাবনা ভাবি তা সবই সবুজ সর্ম্পকীয়। আমার সাথে প্রযুক্তির একটা দন্দ্ব তৈরী হবে, এটা স্বাভাবিক। আমি মেনে নিয়েছি। নতমুখেই।
রাত কতো হলো জানিনা। চোখে ঘুম নামেনি এখনো। আদৌ নামবে কিনা বলা মুশকিল। বাসায় নেট লাইন বিচ্ছিন্ন করে রেখেছি। নেট মানেই নিজের কমজোরী স্বভাবটার নেজ ধরে ঠুনকো টানাহ্যাঁছড়া। আমি ওসবে এখন আর বিশ্বাস করিনা। তবু কখনো সখনো খুব, খুব ইচ্ছে করলে ল্যান্ড ফোন দিয়ে ব্রাউজ করি। বেশি দূর যেতে পারিনা। আমার আঙুলের ডগায় খুব কম ওয়েব সাইট ঘুরোঘুরি করে। যেগুলো খুব চেনা। যখন খুব খুব ইচ্ছে করে কপালে ভাঁজ ফেলতে, সহসা রেগে ওঠতে, তখন কারো ডাহা মিথ্যে কথাগুলো পড়তে থাকি। যখন খুব লোনলী অনুভব করি তখন সোজা 'গুগলের' পেটে ঢু মেরে, কাউকে নিয়ে শুধু শুধু খুড়োখুড়ি করি। বরাবরের মতোই ওসব পানসে। তবু সময়তো কাটে। রাত বারে। চোখে ঘুম নামে।
** ২৪ নভেম্বর, ২০০৭ইং এর লেখা।
তুই কখনো কোনো মানুষকে মরতে দেখেছিস? আমি দেখেছি। কেমন অসহায় থাকে তখন সে। কেমন ঘোরতর এক শূণ্যতা থাকে তার সবকিছু জুড়ে। থাকে তার চারপাশে অদ্ভুত, অচেনা-অজানা এক ধোঁয়াটে গন্ধ। এসব যদিওবা সহ্য করা যায় কিন্তু মৃত মানুষের চেহারা আমি সহ্য করতে পারিনা, একদম। ওতে আমি আলো দেখিনা, হাসি দেখিনা, চোখের মায়াময় দৃষ্টি দেখিনা। প্রথম যাকে মরতে দেখেছিলাম তখন সেটা উপলব্ধি করার মতো বয়স ছিলোনা। দ্বিতীয়বার যাকে মরতে দেখলাম এবং যে আমার হাতের উপরই মারা গেলো তার ঘন্টা কয়েক আগ পর্যন্ত আমি তার ১শ মাইলের ভেতরো ছিলাম না। মাস দুই পর আমি যখন তার নিকট পৌঁছলাম তখন আমার বয়স যথেষ্ঠ বুদ্ধিমান ছিলো এটা বুঝতে যে পুরুষ মানুষও কখনো সখনো কান্না-কাটি করে। আমি বুঝতে পারছিলাম না ঠিক আমি কি হারাচ্ছি। আমার দুচোখ ছুঁয়ে যে জল গড়িয়ে যাচ্ছিলো সেটা কতোটা বছর পর গড়াচ্ছে তার সঠিক ক্যালকুলেশন এতোটা বছর পর এতোটা তীহ্ম আর কৌশলী ব্রেন নিয়েও আমি সমাধা করতে ব্যর্থ।
আজ পূর্ণিমা। তাই মশার ভৌ শব্দের জ্বালাতন উপেক্ষা করে কিছু লিখতে বসা আমার। রুপোলী আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে আমার ঘরের চারপাশ এবং আমি। কোন ছাগল পূর্ণিমাকে ঝলসানো রুটি বলেছে সেটা মনে করতে পারছি না। এতো সুন্দর একটা মুখকে কেউ ঝলসানো রুটি বলতে পারে? কবিরা এমনিতেই মিথ্যুক হয়। মিথ্যে আর কল্পনা ছাড়া কবিতা লেখা সম্ভব না। আমি সাহিত্যিক না। কবি না। কিন্তু মাঝে মাঝে আমার খুব লিখতে ইচ্ছে করে। নিলর্জ্বের মতো। লিখি না আমি। লিখতে ভাল্লাগে না।
যখন ডায়রী লিখতাম তখন অদ্ভুত সব বিষয় নিয়ে লিখতাম। কাকের ঠ্যাং, বকের ঠ্যাং নিয়ে আমার সুদূর প্রসারী গভেষনা থেকে শুরু করে স্বপ্নাকে লেখা কতোশতো কবিতা, প্রেমপত্র, প্রেম নিয়ে আবেগ টসটস কতোশত কথা... ভালোলাগা ছিলো ওতে। প্রথম ডাইরীটা আমি কয়েকটা চিঠির সাথে পুড়িয়ে ফেলেছি। ২য় ডায়রীটা পড়িনা। তার অক্ষত থাকাটা একটা বিস্ময়। তৃতীয় ডায়রীটা আমার পাগলাটে, অসমাপ্ত। ছেঁড়া ছেঁড়া, ভাসা ভাসা কতো কি ওতে ভরা। শার্ট, প্যান্ট, শর্ট, গ্যাঞ্জি, স্যান্ডেলের তালিকা থেকে ওতে প্রেমপত্র পর্যন্ত লেখা। আছে গিটারের কিছু কর্ড। কিছু নিজের লেখা গান। কিছু প্রিয় মানুষ নিয়ে মূল্যায়ন। আছে কিছু প্রিয় চেহারা আঁকার কতোশতো বাহারী প্রচেষ্টা। রাস্তায় কোনো ফকিরকে ভালো লেগেছে সে অনুভূতি নিয়েও কয়েক লাইন... এসব...।
এখন ডায়রী টাইরী লেখা হয়না। প্রযুক্তি মানুষকে খুব বদলে দিচ্ছে। অনলাইনেই এখন ভাব বিনিময় করা যায় হারহামেশা। জীবন কতো সহজ এখানে। বৃষ্টি বাদলের মতো কতো ঝরঝরে আবেগ এখানে, ঘুরোঘুরি করে। মানুষ কতো সহজে নিজেকে এখানে গোছগাছ করতে পারে...। আমি এখনো প্রযুক্তির সাথে নিজেকে মানিয়ে পারিনি অতো। খুব অগোছালো, আর খুব ঘাড় ট্যারারা হয়তো এসবে মানিয়ে নিতে পারেনা। আমার ওতে কোনো দাবী নেই। নিজের প্রতি স্লেশ কিংবা তিক্ততাও নেই। আমি যা দাবি করি, যা ভাবনা ভাবি তা সবই সবুজ সর্ম্পকীয়। আমার সাথে প্রযুক্তির একটা দন্দ্ব তৈরী হবে, এটা স্বাভাবিক। আমি মেনে নিয়েছি। নতমুখেই।
রাত কতো হলো জানিনা। চোখে ঘুম নামেনি এখনো। আদৌ নামবে কিনা বলা মুশকিল। বাসায় নেট লাইন বিচ্ছিন্ন করে রেখেছি। নেট মানেই নিজের কমজোরী স্বভাবটার নেজ ধরে ঠুনকো টানাহ্যাঁছড়া। আমি ওসবে এখন আর বিশ্বাস করিনা। তবু কখনো সখনো খুব, খুব ইচ্ছে করলে ল্যান্ড ফোন দিয়ে ব্রাউজ করি। বেশি দূর যেতে পারিনা। আমার আঙুলের ডগায় খুব কম ওয়েব সাইট ঘুরোঘুরি করে। যেগুলো খুব চেনা। যখন খুব খুব ইচ্ছে করে কপালে ভাঁজ ফেলতে, সহসা রেগে ওঠতে, তখন কারো ডাহা মিথ্যে কথাগুলো পড়তে থাকি। যখন খুব লোনলী অনুভব করি তখন সোজা 'গুগলের' পেটে ঢু মেরে, কাউকে নিয়ে শুধু শুধু খুড়োখুড়ি করি। বরাবরের মতোই ওসব পানসে। তবু সময়তো কাটে। রাত বারে। চোখে ঘুম নামে।
** ২৪ নভেম্বর, ২০০৭ইং এর লেখা।
Labels:
চলে যাচ্ছে দিন...,
ছেঁড়া মানুষের গল্প,
না-মানুষ,
মেঘবালিকা,
যন্ত্রণা
Friday, November 23, 2007
Wednesday, November 21, 2007
গাভাস্কার আমার চেয়েও ছোটো?
জুনের তিন তারিখ, 2000। বঙ্গবন্ধু ষ্ট্যাডিয়াম। চির প্রতিদ্বন্দী ভারত বনাম পাকিস্তানের খেলা, তাই ক্রিকেট দুনিয়া চরম গরম। পুরো ষ্ট্যাডিয়াম এলাকা চিৎকার ছ্যাছাম্যাছিতে গমগম করছে। প্রতিবারের মতো দেরী করে ষ্ট্যাডিয়ামে প্রবেশ করলাম। সি।এম. কে সাইন দেখালাম, কিছু বলতে গিয়েও সে কিছু বললো না। রোবার মেট বলে কথা! আমাকে বলা হলো তড়িগড়ি করে যেন হসপিটালী বক্সে ডিউটিতে চলে যাই। ডিউটি পড়েছে নন-এসি দিয়ে হসপিটালী বক্সে যাবার গেটে। জায়গামতো গিয়ে পেলাম আমার সহকারী বন্ধুকে। নন-এসিতে প্রধানমন্ত্রীর/ প্রধান অতিথির জন্য একটা বিশেষ আসন রয়েছে। তার আশে পাশে অতিথিদের আসন। বিশেষ কোনো উপলক্ষ্য ব্যতীত এখানে খুব একটা লোক সমাগম হয়না। এর মধ্যে আমার সহকারী বন্ধুটি মহাসুখে নন-এসির আসনে বসে খেলা দেখায় ব্যস্ত হয়ে গেছে। আমি হসপিটালী বক্সের টিকেটধারীদের কাছ থেকে টিকেট চেক করে ছেড়ে দিচ্ছি। এখানে বলে রাখা ভালো নন-এসির ঠিক পেছনে ছোট এক গেট। এটায় সবসময় তালা ঝোলানো থাকে, চাবি ডিউটিরত স্কাউটদের হাতেই থাকে। দর্শক যারা আসবে তারা ওয়েষ্টার্ণ গ্যালারী হয়ে আসবে। এই গেটটা সম্ভবত ইমাজেন্সির জন্য রাখা হয়েছে। হসপিটালী বক্সের পেছনে, উপরের প্রধান ক্যামেরার ডান পাশে পেপসীর জন্য আলাদা রুম রয়েছে। হসপিটালী বক্সে এখান থেকেই লান্চ দেয়া হয়। পেপসীর কর্মচারীরা অতো ঘুরপথে না যেয়ে আমাদের তেলিয়ে ইমাজেন্সি গেটটা খুলে পেপসী নিয়ে যায়। আমরা বিরক্ত হলেও খুলে দেই। স্কাউটদের জন্য পেপসী পানে কোনো লিমিটেশন নেই! কেনো নেই সেটা বুঝতে অতোটা বুদ্ধিমান না হলেও চলে ;)
খেলার ১৫ মিনিট পর ওয়েষ্টার্ণ গ্যালারী ঘুরে এক লোক হসপিটালী বক্সের দিকে এগিয়ে এলেন। আমি নড়েচড়ে দাঁড়াই। শ্যুট টাই পড়া লোক। আমার নাক বরাবর লম্বা! তাকে টিকিট দেখাতে বলি- তিনি বিড়বিড় করে কি বললেন বুঝলাম না। মিনিট খানেক তাকে দাঁড় করিয়েই রাখলাম। পরে সহকারীকে হাঁক দেই, এই রাসেল এইদিকে আয়তো। উনার টিকিট নাই, টিকিট ছাড়া উপরে যেতে চায়। ও এসেই চোখ বড়বড় করে বলে- স্যার যাইয়ে, যাইয়ে। আমি হতভম্ব।
-- ঐ ব্যাটা তুই তাকে যেতে দিলি কেন?
-- তার মাথা ঠিক আছে?
-- আমার মাথা ঠিক আছে, তোর ঠিক নাই। তুই উনাকে যেতে দিলি কেন?
-- ছাগল উনি কে জানিস?
-- কে?
-- গাভাস্কার
-- গাভাস্কার! যাহ বেটা উনিতো আমার চেয়েও ছোটো!
সেদিন এটা নিয়ে অনেক হাসিঠাট্টা হলো। মাইক্রোতে বসে আমার বার্থডে পালন করা হলো এভাবে- হ্যাপী বেড ডে, হ্যাপী বেড ডে!
খেলার ১৫ মিনিট পর ওয়েষ্টার্ণ গ্যালারী ঘুরে এক লোক হসপিটালী বক্সের দিকে এগিয়ে এলেন। আমি নড়েচড়ে দাঁড়াই। শ্যুট টাই পড়া লোক। আমার নাক বরাবর লম্বা! তাকে টিকিট দেখাতে বলি- তিনি বিড়বিড় করে কি বললেন বুঝলাম না। মিনিট খানেক তাকে দাঁড় করিয়েই রাখলাম। পরে সহকারীকে হাঁক দেই, এই রাসেল এইদিকে আয়তো। উনার টিকিট নাই, টিকিট ছাড়া উপরে যেতে চায়। ও এসেই চোখ বড়বড় করে বলে- স্যার যাইয়ে, যাইয়ে। আমি হতভম্ব।
-- ঐ ব্যাটা তুই তাকে যেতে দিলি কেন?
-- তার মাথা ঠিক আছে?
-- আমার মাথা ঠিক আছে, তোর ঠিক নাই। তুই উনাকে যেতে দিলি কেন?
-- ছাগল উনি কে জানিস?
-- কে?
-- গাভাস্কার
-- গাভাস্কার! যাহ বেটা উনিতো আমার চেয়েও ছোটো!
সেদিন এটা নিয়ে অনেক হাসিঠাট্টা হলো। মাইক্রোতে বসে আমার বার্থডে পালন করা হলো এভাবে- হ্যাপী বেড ডে, হ্যাপী বেড ডে!
Tuesday, November 20, 2007
আমার মতো পাগোল প্রায়!
-- দে
গভির হুংকারে চমকে উঠি খুব। কাছেই দাঁড়িওয়ালা এক লোক বসে আছে। আমি তার দিকে এগিয়ে যাই, কাঁধে ঝোলানো ক্যামটা হাতে নিয়ে টিউন করতে করতে প্রশ্ন করি- 'কি দেবো?' সে কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়। চোখের তারা ব্যতিত অন্য কোথাও সেটা দেখা যাচ্ছে না। মুখটা ভাবলেশহীন। আমার এগিয়ে যাওয়াটা তার কাছে প্রত্যাশিত না সেটা বুঝা যাচ্ছে। গম্ভির শব্দটা হঠাৎ করে নিচু হয়ে যায়, 'পাঁচ টাকা'। উহু কথার ধারটা একটুও কমেনি।
-- কেনো দেবো পাঁচ টাকা, চোখে আমার কৌতুক ঝরে। সে চুপ হয়ে যায় হঠাৎ। এর মধ্যে দুটো ছবি তুলে ফেলেছি। তার পকেটে ৩/৪টা কলম দেখা যাচ্ছে। 'এই কলম দিয়ে কি করা হয়?' সে নিরুত্তর থাকে। 'ঠিক আছে। পাঁচ টাকা দিতে পারি যদি বলেন এই পাঁচ টাকা দিয়ে কি করবেন।' সে কিছুক্ষন আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখ না নামিয়েই বলে- 'লাগবো না'। আমি ক্যামটা ফের কাঁধে ঝুলিয়ে সামনের গ্রামের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি। এ পাগোল না। আবার স্বাভাবিক মানুষও না। অনেকটা যেন আমারই মতোন। হা হা হা। ওয়েট, একটা প্রশ্ন, সে খেলছেটা কার সাথে? আই ডোন্ট নো, আই ডোন্ট নো। অনেক ঋণ নেই বেটার। ঋণী থাকলে পাগোল হবার মজাটা টের পেতে সাধু! নি:শব্দে হাসতে থাকি লাগামহীন। ঠোঁট, চোখ, মুখ, ছায়া, সবখানেই অজানা এক উল্লাস। কেনো এতো উল্লাস আজ? উহু... অসুস্থ্য মরিচিকারা তা জানেনা। জানবেনা কোনোদিন।
Labels:
ছেঁড়া মানুষের গল্প,
না-মানুষ,
মেঘবালিকা,
যন্ত্রণা,
স্বপ্ন সবুজ
Monday, November 19, 2007
জলছবি
মাঝে মাঝে নিজেকে ব্যবচ্ছেদ করি। কখনো দুভাগে, কখনো তিন, চার, পাঁচ, ছয় এমন অনেক অনেক ভাবে নিজেকে বিভাজন করি। আমি কি সেই, কিংবা আমি কি এই, এমন সব উদ্ভুত প্রশ্ন করি নিজেকে প্রায়শই। উত্তরগুলো কখনোই স্বাভাবিক হয়না। সময়ের সাথে বিকৃতির পাখা পুরনো দেয়ালের সবুজ শ্যাওলার মতো জীবনের সাথে সেঁটে যায়। এটাই নিয়ম। ঘড়ির কাটায় ব্যস্ততা ভর করবে আর তুমি ব্যস্ত নগরীর বুকে তোমার সুগভীর পাগলাটে ধ্যনধারনার আবেগী মারপ্যাঁচ ফলানোর চেষ্টা করবে। অবশেষে অসহনীয় ব্যার্থতা। ক্লান্ত আঁধারে, তুমি, হাঁ অনেক তুমির তুমি ফের হাত পা ছুঁড়ে নৈশব্দিক চিৎকার, ছ্যাঁছামেছি করবে, কখনো রেলিংয়ের কোনে হাঁটুর ভাঁজে মাথা গুজে নোনতা জল লুকোবে, ফের তুমি নি:সঙ্গ হবে... ফের এলোমেলো হয়ে সপ্তর্ষীর বুকে আলগা ভালোবাসা আঁকবে... এমনই সব অবাস্তব ওঠা-বসার সাথে সাখ্য গড়ে তুমি মাঝরাতে তোমার তুমিকে বিভাজন করবে। কখনো স্মৃতির পাখনায় নতুন জলছবি, কখনো পুরোনোকে টেনে ঘষামাজা... তারপর ফের সেই পুরনো চটি পাড়ি দিবে মাইলের পর মাইল, দু' কপি তুমি আর অক্ষরের ভাঁজে পেট চালানোর সায়েন্সের ফর্মুলা উপহাস করবে তোমাকে ক্ষনে ক্ষনে, লোকাল বাসের ভরাট নিশ্বাসে খ্যাপবে তোমার ভিশন প্রচন্ড আক্রোশে, তুমি হয়তো ভিষন এলোমেলো হয়ে এক তুমুল আশ্বাসের জন্য স্মৃতিকে খুড়ে খুড়ে পুকুর, পুকুর থেকে নদি, নদি থেকে সাগর... বানিয়ে নিজেকে প্রবোধ দিবে, মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিবে, নতুন করে কিছু সুখস্বপ্ন...দ্যাখবে হয়তো... তারপর প্রচন্ড নি:স্ব হয়ে নিজেকে হয়তো তুমি ফের প্রশ্ন করবে- এ্যাই তুই কি বেঁচে আছিস?
Subscribe to:
Posts (Atom)