Showing posts with label আশা-নিরাশা. Show all posts
Showing posts with label আশা-নিরাশা. Show all posts

Monday, December 31, 2007

সৃষ্টি


প্রায় এক মাসের সফল কর্মসূচির পর বরগুনা থেকে যখন ঢাকায় ফিরলাম তখন শরীর/মনের অবস্থা যাচ্ছেতাই। মনে মনে ভাবছিলাম লম্বা এক ডুব দিবো। সবকিছু থেকে। খাবো, দাবো, ঘুমে ডোম হবো। তেমন কিছুই হতে দিলো না নিয়তি। জরুরী তলব, বাড়িতে কোরবানি করতে হবে। অবশেষে চাঁন রাতে শেষ টিকিট নিয়ে যখন সৌদিয়ার বাস সার্ভিসে চেপে বসলাম তখনই ফোন। জানানো হলো বড় চাচা মারা গেছেন। গাজীপুর, দেড় ঘন্টার পথ। আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হলো তড়িগড়ি। বাস ছেড়ে দিবে একটু পর। দশ-বিশ-ত্রিশ গুনতে হলোনা। কর্তব্য বলতে শুধু অ্যামেরিকায় এন্সারিং মেশিনে এক মিনিটের বক্তৃতা দিয়েই সিটে শরীর এলিয়ে গভির ঘুমে মগ্ন হলাম। লোকটার প্রতি আমার কোনো মায়া-মমতা ছিলোনা। এখনো নাই। আমার ভেতরে অনেক অনেক জ্বালা, কষ্ট, হতাশা জাগিয়ে লোকটা হুট করে চলে গেছে। এতে আমার হতাশা বেড়েছে বৈ কমেনি।

যাইহোক, নিজের গ্রামে কিছু একটা করার স্বপ্ন ছিলো। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না ঠিক কিভাবে শুরু করবো। অবশেষে সেটা এবার দেখতে পেলাম। গ্রামের একটা অংশ বাকি অংশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, পারিপার্শ্বিক সব দিক থেকে তারা পিছিয়ে। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখতে পেলাম এখানে শিক্ষার হার অন্যান্য অংশের তুলনায় অনেক কম। বন্ধুরা বললো ল্যাদা-ফ্যাদাদের শিক্ষার দিকে নজর দিতে। তাহলেই উন্নয়ন সম্ভব। আমি সেদিকে হাঁটলাম না। মা'দের নিয়ে কাজ করতে ইচ্ছে করলো। এখানে বয়স্ক/বিবাহিত মহিলাদের শিক্ষার হার অনেক কম। ভেবে দেখলাম যদি এদের কোনো ভাবে শিক্ষিত করতে পারি তাহলে বাজিমাত করা সম্ভব। একজন মা একটি পরিবারের মুল অভিভাবক। মা শিক্ষিত হলে ফ্যামিলি এমনিতেই ডেভেলপ করবে। একজন কর্মজীবি বাবা পরিবারে কতটুকু সময় দিতে পারে? মা পরিবারকে ২৪ ঘন্টা সময় দিয়ে থাকে। উপরোন্তু সন্তানরা বাবার চেয়ে মাকে খুব বেশি কাছে পায়। তারা মায়ের আদর, স্নেহ, ভালোবাসা পেয়ে বেড়ে উঠতে থাকে। তাই একজন মা যা বলেন সন্তানরা তাই আগ্রহ ভরে করার চেষ্টা করে। পারিপার্শ্বিক পরিবেশ সম্পর্কে মা'কে বুঝাতে পারলে পরিবেশের এমন ছ্যাঁড়াব্যাঁড়া অবস্থারও উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। তাই, মা'কে শিক্ষিত করতে পারলে সবকিছুকে শিক্ষিত করার একটা চান্স নেয়া যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো এই ঝানু মহিলাদের কিভাবে বোঝাবো। এর আগে এখানে সরকারীভাবে এমন উদ্যেগের কম চেষ্টা হয়নি। সবই শুরু হয়ে শেষ হয়ে গেছে। সুবিধে হলো এদের কাছে আমি মোটামুটি পরিচিত। আমার এই পরিচিত তাদের ভেতর বিপ্লব ঘটাতে পারে, তাই সুযোগটা কাজে লাগানোর জন্য উঠেপড়ে লেগে গেলাম।

৫ সদস্যের একটা কমিটি করলাম। এরা ডোনেট করবে। মাসিক যা খরচ হবে তার পুরোটাই এরা বহন করবে। স্কুল ঘর ঠিক করার পর ঘরের মালিক জানালো তাকে ভাড়া দিতে হবে না। কমিটির সবাই এতে ভিষণ খুশি। 'সৃষ্টি' নিয়ে আজম আর মিলনের আগ্রহ দেখে ভালো লাগলো। আমার অবর্তমানে এরা এই কাজটাকে এগিয়ে নিতে পারবে মোটামুটি। অবশেষে চারজন শিক্ষিকার ব্যবস্থা করতে পারা গেল। এদের ৩ জন কোনো টাকা নিবে না। ১ জনকে মাসিক ১০০০ টাকা দিলেই চলবে! পূর্বে দেখতে পেয়েছি প্রায় প্রতিটি প্রোজেক্টের আগে একটা অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে হয়। যা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক অনেক কম অর্থনৈতিক প্রেসার 'সৃষ্টিতে' পেলাম। পুরোপুরি গোছগাছ করে সবাইকে নিয়ে স্কুল ঘরে একটা মিটিং এর আয়োজন করা হলো। শুধুমাত্র ছাত্রীদের নিয়ে মিটিং। যারা আসবে তাদেরকে প্রাথমিকভাবে বিনামূল্যে বই, চক, ডাস্টার দেয়া হবে। আমার ধারনা ছিলো লজ্জা-শরম দূরে হটিয়ে ৭/৮জন মতো হয়তো আসবে। সেই অনুযায়ী ১২ জনের জন্য জিনিসপত্র কিনে আনা হয়েছিল। বিপত্তি ঘটলো মিটিংয়ে মহিলাদের উপস্থিতির পর। ৩০/৩৫ জন ছাত্রী দেখে আমার মতই সবাই তাজ্জব! যাই-হোক, ২০ মিনিট টানা ব্রিফ দিলাম। সুবিধে হলো এদের চোখে সহজেই জল এনে ফেলা যায়। এদের একটু ভালোবাসা দেখাতে পারলে এরা মানুষের জন্য কি না করতে পারে? তাদেরকে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হলে :

১। ছাত্রীদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাঠ্যেদান করা হবে।
২। সপ্তায় ৬ দিন ক্লাশ হবে। ক্লাশ শুরু হবে বিকেল ৩টায়।
৩। ১ জন শিক্ষক সপ্তায় ২টি করে ক্লাশ নিবেন।
৪। সপ্তাহের প্রতি বৃহ:স্পতিবার একটি করে মিটিং হবে। এখানে ছাত্রীদের প্রোগ্রেস, তাদের সমস্যা, অভিযোগ, পারিপার্শ্বিক বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা হবে। অভিযোগ, সমস্যাগুলো আজম লিপিবদ্ধ করে রাখবে। পরের ক্লাশ থেকে তা সংশোধনের চেষ্টা করা হবে।
৫। প্রত্যেক মাসে একটি করে বড় মিটিং হবে। সেখানে কমিটির সবাই উপস্থিত থাকবো। যাবতীয় সমস্যা সমাধান দেয়ার চেষ্টা করা হবে তখন। মজার মজার সব ইভেন্টের মাধ্যমে ছাত্রীদের শিক্ষার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হবে।
৬। কোনো কারণ ছাড়াই কেউ তিন দিন ক্লাশে অনুপস্থিত থাকলে পরবর্তী অনুপস্থিত ক্লাশের জন্য ২ টাকা হারে জরিমানা করা হবে।
৭। আরো কিছু...।

এর মানে হলো আমাকে প্রতি মাসে গ্রামে যেতে হবেই! আমি ত্যাক্ত বিরক্ত হবো না। বরং প্রোজেক্টটা দাঁড়িয়ে গেলে আমার চেয়ে সুখি মানুষ পৃথিবীতে পাওয়া ভার হবে। 'সৃষ্টি' নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। সমস্যা হলো তেমন অরগানাইজ জনোবল নাই। যে চারজন কমিটিতে আছে তারা হাঁ হয়ে আমার সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করে। আমার চাই অরগানাইজ জনোবল আর পাশে দাঁড়িয়ে আশ্বাস দেবার মতো প্রিয়জন। তেমন পাওয়া ভার। দাঁড়িয়াল ঠাকুরের কবিতাই এখন শেষ সম্বল, "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলোরে..."

Tuesday, December 18, 2007

মানুষ দেখলে তবে আলো

কতোদিন হলো মিরাকল দেখিনা। আমি মিরাকল পেতে, দেখতে ভালোবাসি। কিন্তু মিরাকলতো আমাকে আর দশজন ভদ্র মানুষের মতো ভালোবাসেনা। তাই মানুষের মিরাকল দেখে যাই।

কখনো কাউকে মিরাকল দেই নাই। আজ একজনকে মিরাকল দিলাম।

আমি যে কষ্টটা এতোদিন ধরে লালন করে এসেছি, সেই একই কষ্ট আমার চোখের সামনে অন্য একজন পেতে পারেনা।
অন্তত আমি বেঁচে থাকতে, না। সামর্থ্য আমার তেমন একটা নেই। তবু...

Monday, December 3, 2007

এক আকাশ, স্বপ্ন

মিথুন রাশির জাতকেরা কেমন হয়? আকাশ অবশ্য কখনো রাশি-টাশি নিয়ে অতো গভিরভাবে নাড়াচাড়ি করেনি। তবে নিজেকে দিয়ে সে যা বুঝে তা হলো- মিথুন রাশির জাতকেরা হয়- প্রচন্ড ঘাড়ট্যারা, আত্মভোলা এবং চাপা রোমান্টিক। অন্যকিছুও হতে পারে। তবে ওর ব্যাপারটা আলাদা। সে প্রিয় মানুষকে যেমন ভালোবাসতে পারে, তেমন ঘৃনা করতে পারেনা। ভালোবাসা সম্পর্কে তার যে ধ্যনধারনা সেটাও কিন্তু কমজোরী নয়। তার মতে, হাসনাহেনার সুভাশ ফুলে নাক ডুবিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। এ থেকে যতদূরে তুমি ছুটবে তত তুমি এর সুভাশ পাবে। আকাশ দূর থেকে সুভাশ নিতে ভালোবাসে। এ বয়সে অনেকেই এক-আধটু ভুলভাল করে থাকে। তবু, কারো জন্য উন্মুখ হয়ে অপেক্ষায় থাকা, দিবানিশি পরস্পর বিরোধী দুটো স্বত্ত্বার সাথে যুদ্ধ করা, নিজের সমস্ত ধ্যনধারনার ঘষামাজা করা... ভুলভালের মধ্যে পরেনা। যদিও আকাশ অপেক্ষাকে মনে-প্রাণে ঘৃনা করে। তারপরও সে কারো কারো জন্য হঠাৎ হঠাৎ অকারণে অপেক্ষা করে। কেন করে সে তা জানেনা।

মানুষের এক সহজাত প্রবৃত্তি হলো- যা সে পায়না তার জন্য সে ভিষন হায়-হুতাশ করে। যা সহজে পায় তা অবজ্ঞা ভরে দূরে সরিয়ে রাখে। আকাশ নিজেকে কম চেনেনা। তবু, মাঝে মাঝে তার নিজেরে নিদারুন করুন মনে হয়। প্রচন্ড অসহায় লাগে তখন। ভিষন একা আর ভিষন মুমূর্ষ মুহুর্ত্বে মানুষ প্রিয়জনের কাছে আশ্রয় চায়। সে চায়না। সে ভিষন মূর্খ পুজারী। সে ফুল দেখবে কিন্তু ছিঁড়বে না। সে ফুল নিজের করে চাইবে কিন্তু পাহারা দিবে না, গাছে পানি দেবে না।

মানুষই সম্ভবত একমাত্র জীব যে নিজেকে খুব দ্রুত বদলে ফেলতে পারে। আকাশ সেটা পারেনা। তার ধারনা মানুষ শুধুমাত্র তার বাইরের রূপটাই বদলাতে পারে, ভেতরটা নয়। কিন্তু মাঝে মাঝে তার বেশ ধান্দা লাগে। যা সে জানছে কিংবা যা সে ভাবছে তার পুরোটাই মিথ্যে নয়তো? মানুষতো প্রতিটি সেকেন্ড মরছে। প্রতিটি সেকেন্ড মানুষ এক একটা নতুন মানুষরূপে আবির্ভূত হচ্ছে। মানুষের ভেতরটাও বদলে যেতে পারে। মানুষের বাইরের পঁচন ভেতরে চলে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। আজকাল ওর চিন্তা-ভাবনারা বড্ড বেশি ঠোঁটকাটা হয়েছে। তবু তারা মানুষকে ভালোবাসে। কারণ মানুষকে তাদের যান্ত্রিক আর কৃত্রিম বলে মনে হয়না। প্রতিটি মানুষই রহস্যঘেরা এক আঁধার। ওদের ভেতরটা শতোমুখী ইচ্ছে, স্বপ্ন, ঘৃনা, ভালোবাসায় ঠাসা। কিছু মানুষ আদতেই একটু অন্যরকম হয়। তারপরও অন্যসব মানুষের মতইতো তারা। তারা মরছে। প্রতিটি সেকেন্ড। প্রতিটি সেকেন্ড তারা নতুন করে কিছু ভাবছে। প্রতিটি মুহুর্তে তারা স্বপ্ন দেখছে নতুন কিছু নিয়ে। প্রতিটি সেকেন্ড তারা নতুন করে ভাবনার ঘুড়ি উড়োচ্ছে। মানুষ তাই সাংঘাতিক এক রাহস্যিক বিষয়। একজন মানুষের সাথে অন্য এক মানুষের কোনো মিল মহব্বত থাকার কথা নয়। তবু অনেক কিছু মিলে যায়। সেটাতো অন্য সব ক্ষেত্রেও মিলবে। শামুককে তার শক্ত খোলস দেখে যেভাবে সনাক্ত করা যায় তেমন মানুষকেও চেনা কঠিন কিছু নয়। শামুকের সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে ধীরালয়ে হেঁটে চলা, কোনো বিপদ দেখলে খোলশের ভেতর নিজেকে গুটিয়ে ফেলা। তাই কোনো শামুক যদি মনে করে যে অমুক শামুকের সাথে তার বেশ মেলে সেটা কিন্তু যুক্তিহীন নয়। যুক্তিহীন হবে তখনই যখন কেউ বলবে- অমুক শামুককে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি, তখন। আকাশ অবশ্য এই ব্যাপারটা নিয়ে মনে মনে খুব হাসে। সে হয়তো কিছু মানুষকে হাড়ে হাড়েই চেনে। তার রহস্যঘেরা যন্ত্রণাময় জীবনে এ ব্যাপারটা একটা বিনোদন। পাখি যতই তুমি উড়ে বেড়াও, তোমায় আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। ইচ্ছে করলে তোমায় আমি উড়িয়ে দিতে পারি, ইচ্ছে করলে তোমায় খাঁচায় পুরতেও পারি... আকাশ মাঝে মাঝে খুব ভাবে উপেক্ষা সরিয়ে বুকে টেনে তাকে এসব শুনাতে। সে কয়েক সেকেন্ড। তারপর ভুলে যায়।

বর্ষা শেষ হয়েছে। বৃষ্টি নেই। বৃষ্টির টুপটাপটুপটাপ শব্দেরাও নেই। বেঁচে গেছি, আকাশ হাসে, একমনে। বৃষ্টির শব্দে তার বিয়ে করতে ইচ্ছে করে। এ ব্যাপারটা চিন্তা করলেই সে চুপসে যায়। তারপর নি:শব্দে হাঁটতে থাকে গন্তব্যহীন। বিয়ে করতে চাইলেতো আর করা যায়না। আকাশের নিজেরে নিয়ে ভাবনা চিন্তা করার ক্ষমতা নাই। তবু আকাশ বিয়ে করবে, বুড়ো বয়সে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটার সময়। তার একটা ইচ্ছে আছে বিয়ের পর বুড়িকে প্রতিদিন একটি করে চিঠি লিখবে! কি লিখবে তাতে? আকাশ যেমন মানুষ- লিখবে, আজকে আলু-ভর্তা সবচে' ফালতু হয়েছে। এমন কান্না-কাটি রান্না করলে দেশান্তরে যাবো। কিংবা। কিংবা। কিংবা? হা হা হা। এমনই। আকাশের ভালোবাসা এবং স্বপ্নো তীরহিত মেঘের মতো। ও ছোঁয়া যায়, একটু অন্যরকম করে। সুপ্ত ভালোবাসাটাও কেড়ে নেয়া যায়... বিমূর্ত ভালোবেসে।

Wednesday, November 28, 2007

হৃদয়হীন সিডর এবং মানুষের ভালোবাসা

আমি যেমন ভালো বন্ধু সার্কেল পেয়ে দারুন তৃপ্তির ঢেকুর তুলি, তেমনি ওদের নিয়ে আমার একটা লুকনো কষ্টও আছে। ওরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। জন্ম থেকেই। তাই ওরা ওদের চারপাশে যা দেখে তা সবই সৌন্দর্য্য নির্ভর। ওদের সমস্ত চিন্তা-ভাবনা ওদের কেরিয়ার আর ভালোবাসা ভালোবাসা খেলা-খেলি নিয়ে। মাঝে মাঝে যে ওরা অনাহারী মানুষ নিয়ে ভাবনা চিন্তা করেনা সেটাও ঠিক না। ওরাও অনাহারী, বিপদগামী মানুষ নিয়ে কথা বলে, ওরাও দূর্যোগ নিয়ে ভাবে এবং ওরাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় কিন্তু নিজেরা কখনোই সক্রীয় ভূমিকা পালনে অগ্রগামী হয়না। ওরা আর্থিকভাবে সাহায্য করতে প্রস্তুত কিন্তু মাঠে নেমে একটা জোয়ার তুলে, মানুষের ভেতর মমতার এক জাগরণ সৃষ্টি করতে ওদের কোনো ইচ্ছা নেই।

এটাই স্বাভাবিক। দেশের উচ্চবিত্ত মানুষের দায় পড়েনি অনাহারী মানুষ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার। যারা ভালো অবস্থানে আছে তারা কখনোই চায়না শুধু শুধু কষ্টকে ডাক দিয়ে ঘরে আশ্রয় দেয়া। কিছু কিছু মানুষ আছে যারা জন্ম থেকেই একটু অন্যরকম। ওদের নিয়ে লেখার সামর্থ্য আমার নাই। ওরা ওদেরই মতো। ওদেরকে শব্দের খাঁচায় আটকানো সহজ নয়।

ইতিমধ্যে মিরপুরবাসী একটা ঘটনা প্রতিদিন দেখছে। দুর্গত মানুষের দুর্দশার কথা ভরা প্লে-কার্ড গলায় ঝুলিয়ে কিছু উচ্ছ্বল তরুন একটা হলুদ বাক্স নিয়ে সাহায্যের আহবানে যাচ্ছে মানুষের বিবেকের দ্বারে দ্বারে। হাঁ বলছিলাম, বির্বতন বাংলাদেশ এর কথা। আমাদের সংগঠন এর কথা। কিছু সম-চিন্তাশীল কিশোর এই সংগঠনের সদস্য। ওরা সবাই বন্ধু নয়, একই পাড়ায়ও থাকেনা, একই কলেজেও পড়েনা। তবু ওরা আত্মীয়। আত্মার আত্মীয়।

প্রথম দিন শুধুমাত্র রেলী দিয়ে শুরু, মাইকিং করে এবং ব্যানার লাগিয়ে আমরা মার্চ করেছি প্রধান সড়কগুলোয়। ঐদিন অর্ধবেলা পর্যন্ত উঠেছে- ৪৬৭৩ টাকা। তারপরের দিন কৌশল বদলানো হলো। মিরপুর কাজী পাড়া থেকে সর্বোচ্চ বিজয় স্মরনী পর্যন্ত আমরা সিটিং গেটলক গাড়িগুলোতে (বিকল্প-১৭, ঢাকেশ্বরী-৩৬, ভলভো, ডিসকভারী, একুশে ইত্যাদি) ৭টা টীম করে ভীক্ষা (কারণ অনেক ভদ্র মানুষ 'মাপ' করতে বলেছেন!) করার জন্য সকাল থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করেছি। প্রতিটি বাসে ২জন করে। একজন পুরনো মেম্বার, একজন নতুন মেম্বার। পুরনো মেম্বার ব্রীফ দিবে, নতুন মেম্বার হলুদ বাক্সটা নিয়ে প্রতিটি যাত্রীর কাছে যাবে। ব্যাপারটা খুবই মজার। এসব বাসে আগে উঠতো নেশাখোড়রা, এখন উঠছি আমরা! ব্রিফিংয়ে কোনো মুখস্ত বিদ্যা ঝাড়তে হয়না আমাদের। বাস্তবে দেশের যা অবস্থা তাই বলেছি আমরা। সে যাইহোক, প্রথম দিন আমরা তুলেছি ২১ হাজারের মতো। দ্বিতীয় দিন উঠেছে ২৩ হাজার টাকা। তৃতীয় দিন উঠেছে ২১ হাজার ৯২টাকা। আমরা ডিসেম্বর ১০ তারিখ পর্যন্ত এই ত্রাণ সংগ্রহ করে যাবো। ইতিমধ্যে শীতবস্ত্র এবং আনুসাঙ্গিক পোষাক সংগ্রহ শেষ হয়েছে। আমাদের টার্গেট ২ হাজার ৫শ কেজি চাল বিতরণ করা, পাশাপাশি অন্যান্য ত্রাণ সামগ্রী। আশা করা যাচ্ছে আগামী দশ তারিখের আগে এই টার্গেট শেষ করা যাবে।

এই কাজ করতে করতে যা অভিজ্ঞতা হচ্ছে তা সবই পুরনো। কিছু তৈলাক্ত চেহারার মানুষ প্রায় প্রতিটি বাসে আমাদেরকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছে। কেউ বলেছে তোমরা যে কলেজ/ভার্সিটির ছাত্র সেটার ডকুমেন্ট কি? তোমাদের আইডি দেখাও, কার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এসব উঠাচ্ছো? ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা সবই ওভারকাম করেছি। কমিশনারের অনুমতি, পুলিশ প্রশাসনের অনুমতি, প্রতিটি সিটিং গেটলক বাসগুলোর হেড অফিসেই আগে থেকেই জানানো হয়েছে, আর আছে আমাদের পরিচয় পত্র। আবার এমনো হয়েছে, যাত্রীরা নিজেদের মধ্যে শুরু করে দিয়েছে ঝগড়া-ঝাটি। তবে সব ছাড়িয়ে মানুষের ভালোবাসাটা সবসময় জয়ী হয়েছে। তৈলাক্ত চেহারার মানুষগুলো কখনোই সঙ্গী পায়নি। যাত্রীরাই কেউ কেউ তাকে বলছে- মিষ্টার ওরাতো বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য পথে নেমেছে আপনি কি করেছেন? আপনি উল্টো তাদেরকে থামিয়ে দেবার চেষ্টা করছেন! কেউ বলছে- অশিক্ষিত বুঝেও না কারা ছাত্র, কারা নেশাখোড়!

আজ আমার ছুটির দিন। আসলে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভ্রমন করা তারপর ব্রিফ দেয়া কম কষ্টসাধ্য নয়। দুপুরে লান্স করতে হয়েছে হোটেলগুলোতেই। ২টা করে নাল-রুটি আর সবজি ভাজি। দুইদিনেই সবাই মোটামুটি অর্ধেক। নতুন কিছু মেম্বার যুক্ত হয়েছে তারাই আজ কাজ করছে, আছে কিছু পুরনে মেম্বার।

সবশেষে বলতে পারি, বাংলাদেশের মানুষের মতো মমতা অন্য কোথাও নেই। যদিও আমি বাংলাদেশের সীমানা আজ পর্যন্ত ক্রশ করতে পারি নাই তবু বলছি কিছু ঘটনার মুখোমুখি হয়েই।

ঘটনা-১ :
আমি এবং আমার সহকারী বিজয় স্মরণীতে নেমে ফিরতি বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছি। সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে (যেহেতু আমাদের বুকে বড় সাইজের প্লে-কার্ড ঝুলানো এবং বুকের বাম পাশে পরিচয়পত্র, এবং হলুদ বাক্স অবশ্যই একটা কারণ)। এমন সময় একটা হ্যাংলা লোক এসে বললো- ভাই আমার কাছে ১ টাকা আছে, আর কোনো টাকা পয়সা নাই। আমি কি আপনাদের এই এক টাকা দিতে পারি? তার কথা শুনে আমার এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো, তাকে খুব খুব আপন মনে হলো, এবং অবশ্যই তার কাছ থেকে ১ টাকা পরম মমতায় নেয়া হলো। লোকটা চলে গেলো।

ঘটনা-২ :
আমরা প্রতিটি বাসে যা উঠেছে তা বাস থেকে নেমে যাবার পর টোটাল অংকটা বলে যাই। ঠিক এভাবে- ধন্যবাদ যাত্রীমহোদয়গণ, বিপদগামী মানুষগুলো পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য। আমরা এই বাসে আপনাদের কাছ থেকে এ পর্যন্ত সাহায্য পেয়েছি মোট- এতো টাকা। অনেক ধন্যবাদ আপনাদের। তো সেদিন আমি নিয়ম মাফিক এটা বলে ঘুরছি বাস থেকে নেমে যাবার জন্য, তখনি এক বৃদ্ধা পাশ থেকে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলছে- বাবা, আল্লায় তোদের অনেক ভালো করবেন। তার চোখ অশ্রুসিক্ত। আমরা নেমে গেলাম।

ঘটনা-৩ :
শেওড়া পাড়ায় আমরা মিলিত হলাম, সব টীম। সব বাক্স ব্রীজের নিচের পিলারের পাশে একের পর এক সাজিয়ে রাখা হলো। সবগুলোই ভারী হয়ে গেছে। আমরা অপেক্ষা করছি অবশিষ্ট মেম্বারদের জন্য। টুকটাক কথা বলছি, এমন সময় এক বৃদ্ধা ভিক্ষুক এসে বললো- বাবা আমি টাকা দেবো, কার কাছে দেবো? আমরাতো সবাই রীতিমতো অবাক! আমাদের এক সহকর্মী হুড়োহুড়ি করে তার বাক্সটা বের করে বললো- আন্টি আমারটায় দেন, আমারটায় দেন, আমার বাক্সে আজ টাকা কম উঠেছে। বৃদ্ধার চোখে সেই কি মমতা, মুখে চির সুবজ হাসি। প্রাণ খোলা হাসি। বৃদ্ধা মাথা নাড়তে নাড়তে চলে গেলেন।

আসলে আমরা কাজ করার শক্তি পাচ্ছি এনাদের ভালোবাসা পেয়েই। তাঁদের ভালোবাসাই আমাদের কাজ করার অনুপ্রেরণা। তারা আজীবন ভালো থাকুন, সুস্থ্য থাকুন, সে কামনা করি।

Monday, September 24, 2007

ইচ্ছেগুলো মিথ্যে ছিলো

জীবনটা গন্ধহীন শুকনো ঝরাপাতা। প্রয়োজন ফুরালে তুমি মূল্যহীন। কিংবা এমনো হতে পারে প্রয়োজনেই তুমি মূল্যহীন! প্রয়োজন তোমাকে মূল্যহীন করেছে। বসে ভাবি নির্জনে, অনেক হয়েছে, এবার সময় হয়েছে হারিয়ে যাবার। আবার সেই ঝাপসা ঝিরঝিরে একরঙি সংঘর্ষ, চোখের পর নেমে আসে রাঙা আঁধার হয়ে। গুটগুট অন্ধকার, চারপাশে। কিছু দেখি না মনে... চোখে... কেবল রিনিঝিনি সুর লাহরী। ভেসে যাচ্ছে নোনা জল হয়ে। আমি মৌন হয়ে শুনতে থাকি, নির্লজ্জ্ব প্রতীক্ষায়... শেষ বারের মতো তাকে দেখবো বলে।